প্রবাসী স্বামীকে ভিডিও কলে দেখিয়ে প্রেমিককে নিয়ে ঘরে ঢুকেন স্ত্রী

স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে সৌদি প্রবাসী আব্দুর রহমান গাজীর (৪৬) জীবন বিষিয়ে উঠেছিল। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই পরকীয়া প্রেম শুরু করেছিল স্ত্রী মুর্শিদা সুলতানা। পরকীয়ার দৃশ্য ভিডিও কলের মাধ্যমে সরাসরি দেখাতো স্বামীকে।

বিদেশের মাটিতে স্ত্রীর পরকীয়াসহ নানা অপকর্মের খবরে মরণ যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছিল আব্দুর রহমান। অবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১২টায় সৌদি আরবের কনফুদা এলাকায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার খবরটি সাথে সাথে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পারিবার ও এলাকা সূত্রে জানা যায়, পরকীয়ার বলি আব্দুর রহমান গাজীর বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আন্দুলিয়া গ্রামে। পেশায় ছিল একজন রাজমিস্ত্রি। তবে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবে শ্রমিকের কাজ করতেন। ১০ বছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন তিনি। ২ পুত্র সন্তান জন্মের পর আব্দুর রহমান গাজী প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেন। প্রথম স্ত্রীর মামলায় আব্দুর রহমান কারাভোগ করেছেন।

পরবর্তীতে প্রেমের সূত্র ধরে আব্দুর রহমান খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার গাওঘরা গ্রামের হেকমত আলী বিশ্বাসের একাধিক স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ে মুর্শিদা সুলতানাকে (৩০) বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবনে মিম নামে তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। মিমের বর্তমান বয়স ৫ বছর। সন্তান জন্মের পর কিছুদিন তাদের দাম্পত্য জীবন সুখেই ছিল।

আব্দুর রহমান গাজী লেখাপড়া না জানলেও দ্বিতীয় স্ত্রী মুর্শিদা সুলতানাকে লেখাপড়া করিয়ে এমএ পাশ করান। বিয়ের পর মুর্শিদা সাতক্ষীরায় ব্র্যাকে (এনজিও) চাকুরি করতেন। আব্দুর রহমান গাজীও বাসা নিয়ে সেখানে অবস্থান করতেন। কিন্তু সেখানে ব্র্যাকের এক কর্মকর্তার নজরে পড়েন মুর্শিদা। নিরুপায় হয়ে চাকুরি ছেড়ে আব্দুর রহমান তাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন। বাড়ি এসে আবারো পুরোনো পেশা রাজমিস্ত্রি কাজ শুরু করেন তিনি।

আব্দুর রহমান গাজী বসবাসের ভিটেটুকু ছাড়া সকল জমিজমা সম্পদ বিক্রি করে সর্বশান্ত হন। ধারদেনা করে বড় ছেলে সাগরকে সৌদি আরব পাঠিয়ে দেন। ছোট ছেলে আকাশ তার মায়ের সাথে মামার বাড়ি অবস্থান করে পড়ালেখা করে। শেষ সম্বল বাড়িটাও অবশেষে স্ত্রীর চাপে ৭ শতক জমিসহ মুর্শিদার নামে লিখে দেয়। হাতের পাঁচ হারিয়ে রহমান গাজী হয়ে পড়ে অসহায়। স্ত্রী মুর্শিদা বিদেশ যাবার জন্য আব্দুর রহমানকে আবারো চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আব্দুর রহমান স্ত্রীর কথামত বিভিন্ন এনজিও, সমিতি ও ব্যক্তির নিকট থেকে ঋণ নিয়ে ৩ মাস আগে সৌদি আরবে চলে যান। ১৫ লক্ষাধিক টাকার মত ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েন আব্দুর রহমান গাজী।

নিঃসঙ্গ জীবনকে আয়েশী করতে মুর্শিদা আন্দুলিয়া গ্রামের আঃ রহমান বিশ্বাস ওরফে কুদার ছেলে শাহ বিএম কিবরিয়ার সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। বিএম কিবরিয়া শাহপুর বাজারের পশ্চিম মাথায় রয়েছে টিনের ব্যবসা। অনেকটা স্বামী-স্ত্রীর মতই ছিল কিবরিয়া ও মুর্শীদার মেলামেশা। কিবরিয়ার অবাধে যাতায়াত চলে মুর্শিদার ঘরে।

পাশের বাড়ির ইজিবাইক চালক মোঃ রাশেদ আকুঞ্জী জানায়, কিবরিয়া বিভিন্ন সময়ে খাবারসহ জিনিসপত্র নিয়ে প্রায়ই মুর্শিদার ঘরে প্রবেশ করতো। যা সবার নজরে ছিল।

আব্দুর রহমান গাজীর সৎ মা রহিমা বেগম (৬৭) জানায়, বৃহস্পতিবার আত্মহত্যার আগে রহমান তার স্ত্রীর কাছে ফোন দেয়। কিন্তু তার স্ত্রী ফোন রিসিভ না করায় আমাকে ফোনে বিষয়টা জানায়। পরে আমি মুর্শিদাকে ডেকে দিলে উত্তরে সে বলে আমার ফোন চার্জে আছে। পরে আমার কথামত মুর্শিদা আব্দুর রহমানের ফোন রিসিভ করে এবং আমাকে সরে যেতে বলে। পরে পাশে থাকা লোক মারফত জানতে পারি আব্দুর রহমান তার স্ত্রীকে কিবরিয়ার পথ থেকে সরে আসতে অনুরোধ করে। কিন্তু মুর্শিদা তার স্বামীর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, আমি কিবরিয়াকে প্রয়োজনে বিয়ে করবো। তোমার মত স্বামী আমার কোন প্রয়োজন নেই।

কল কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ পর মুর্শিদা তার স্বামীর ফোনে কয়েকবার রিং দিলে তা আর রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে সৌদি প্রবাসি ওলিয়ারের স্ত্রীর মাধ্যমে ওলিয়ারের ফোনে মুর্শিদা রিং করিয়ে তার স্বামীর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চায়। তখন তাদের কর্মস্থল থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে মরুভূমির মধ্যে একটি ঘরে আব্দুর রহমানের ঝুলান্ত লাশ দেখতে পায়।

আব্দুর রহমান গাজী বৃহস্পতিবার আত্মহত্যার দিন সকালে স্বজনদের অনেকের সাথে মোবাইলে তার পারিবারিক কষ্টের কথা জানায়। এমনকি সৌদি আরবে সহকর্মীদেরও পারিবারিক কষ্ট আর যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করবে বলেও জানায়।

আব্দুর রহমানের সৎ মা রহিমা বেগম আরো জানায়, আত্মহত্যার আগের দিন রাত সাড়ে ১১টায় আমাকে ফোন দিয়ে রহমান মুর্শিদার ঘরে যেতে বলে। আব্দুর রহমান আমাকে বলেছিল ঘরে লোক ঢুকেছে, আমাকে সে ভিডিও কলের মাধ্যমে লোকটাকে দেখিয়েছে। তখন আমি বউমাকে ডাকলে দরজা না খোলায় আমি ফিরে আসি।

আত্মহত্যার আগে মুর্শিদার পরকীয়া বিষয় নিয়ে আব্দুর রহমান তার বোন সালমা, ভাগ্নি সোনিয়া পপিসহ অনেকের সাথে কথা বলেন। ভাষ্যমতে আব্দুর রহমান অতি কষ্টে তাদের জানায়; আমার সুখ নেই। সবই আমার কপাল। আমি মুর্শিদাকে ফেসবুক আইডি বন্ধ করতে বলেছি কিন্তু সে বলেছে এটা সম্ভব না। সে নাকি কিবরিয়াকে বিয়ে করেছে। এ সমস্ত কথা আমাকে বলছে।

কর্মস্থলে সহকর্মীরা আব্দুর রহমানের অবস্থান না থাকায় তাকে খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে মরুভূমির মাঝে একটি ঘরে ঝুলান্ত অবস্থায় আব্দুর রহমানের লাশ উদ্ধার করেন প্রবাসী চাচাতো ভাই এমদাদুল হক ও ওলিয়ার রহমান। লাশ স্থানান্তর করার অপরাধে তাদের ২ জনকে আটক করে সৌদি পুলিশ। লাশ নামানোর সময় তারা আব্দুর রহমানের মোবাইল সেটটি আত্মহত্যা করা ঘরের চালে স্থাপন করা ছিল। ধারণামতে আত্মহত্যার দৃশ্য তার স্ত্রীকে প্রদর্শন করছিল।

এদিকে আব্দুর রহমানের লাশ ফেরত আনার ব্যাপারে তার বড় ছেলে ও চাচাতো ভাইয়েরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে পারিবারিক সূত্র জানায়।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর আব্দুর রহমানের আত্মহত্যার নেপথ্য কাহিনী উদঘাটন ও ৩ সন্তানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আন্দুলিয়া গ্রামের ঐ বাড়িতে শোকাহত পরিবেশে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এক আলোচনায় বসেন। বৈঠকে মুর্শিদা সুলতানা তার পরকীয়া প্রেমের উপাখ্যান অকপটে স্বীকার করেন এবং আব্দুর রহমানের ৩ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের নামের বসবাসের ভিটে তাদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেয়ার ঘোষণা দেয় এবং মুর্শিদা শেষমেশ তার পরকীয়া প্রেমিক কিবরিয়ার ঘরে উঠিয়ে দেয়ার জন্য তাদের কাছে দাবি জানান।

বৈঠকে উপস্থিত স্থানীয়দের নিকট মুর্শিদা সুলতানা জানায়, আব্দুর রহমান বিভিন্ন সময়ে কিবরিয়ার স্ত্রীর মোবাইলে ম্যাসেস দিত। তখন আমি আমার স্বামীকে বলেছিলাম আমিও কিবরিয়ার সাথে পরকীয়া প্রেম করবো। কিন্তু মুর্শিদা বৈঠকে তার কোন প্রমাণ দেখাতে পারেননি। যা এলাকাবাসী অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

সৌদি প্রবাসি শফিকুল ইসলাম তার ফেসবুকে বিচার দাবি করে বলেন, শাহপুর বাজারের দোকানদার শাহ বিএম কিবরিয়ার সাথে রহমান ভাইয়ের বউ খারাপ থাকায় রহমান ভাই গলায় রশি দিয়ে মারা গেলেন। আমরা এর বিচার চাই।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*