ঘরবন্দী, মুটিয়ে যাওয়া নারী থেকে দেশসেরা বডিবিল্ডার

সারা বিশ্বের একমাত্র না হলেও অল্প কিছু নারী বডিবিল্ডারদের একজন ভারতের হায়েদ্রাবাদের কিরন ডেম্বলা। বডিবিল্ডার হওয়ার ইচ্ছা না থাকা স্বামী-সংসার আর দুই বাচ্চা নিয়ে আর ১০ জন ভারতীয় গৃহিনীর মতোই ছিলেন, সুখে-দুঃখে কেটে যাচ্ছিল দিন। বিপত্তিটা বাধে ২০০৬ এ এসে, যখন মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধে তার। সংসারবন্দী কিরন অসুস্থতার কারণে ঘরবন্দী হয়ে যান।

বিয়ের পর দুই বাচ্চার জননী হয়ে মুটিয়ে যান, এর উপর ডাক্তারের প্রেসক্রাইব করা ওষুধের রিয়্যাকশনের কারণে ওজন বেড়ে হয় ৭৬ কেজি। ওজনও নিয়ন্ত্রণ করতে ভর্তি হন বাড়ির পাশের জিমে। প্রতিদিন ভোর ৫টায় জিমে যেতেন, সেখানে ৪-৫ ঘন্টা ব্যায়াম করে বাড়িতে বাচ্চাদের কাছে ফিরে আসতেন। এভাবে ৬-৭ মাস কঠোর পরিশ্রম করে তিনি ২৪ কেজি ওজন কমান।

তার ভাষায়, ২৪ কেজি ওজন কমানোটা আমার জন্য দারুণ এক ফিরে আসা ছিল, আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল অনেক। আমার এই ৬-৭ মাসের রুটিনটাকে আমি ভালবেসে ফেলি এবং ভাবি, কিছু যদি করতেই হয়, তবে কেন এখান থেকেই নয়? এই ভাবনা থেকেই তিনি জিম ট্রেইনার হওয়ার একটি কোর্স করে ফেলেন। এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়ার গল্প২০০৮ সালে নিজেই একটি জিম দেন। সেখান থেকে তেলেগু অভিনয়শিল্পী রাম চরণের স্ত্রী উপাসনা কামিনী তার খোঁজ পান এবং তার কাছে ফিটনেস ট্রেনিং নেন। উপাসনার পর অভিনয়শিল্পী তামান্না ভাটিয়া ও আনুষ্কা শেট্টিকেও তিনি ট্রেনিং দেন যথাক্রমে মিরচী ও বাহুবলী সিনেমার জন্য। ততদিনে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে ‘সেলেব্রিটি ফিটনেস ট্রেইনার’ হিসেবে। রাজামৌলি, প্রভাস, প্রকাশ রাজের মতো তারকারাও তার কাছে ট্রেনিং নেন, কেউ হয়তো তাদের নিয়মিত ফিটনেস ধরে রাখার জন্য, আবার কেউ সিনেমার কোনো চরিত্রের প্রয়োজনে।

এভাবে কয়েকবছর কাটানোর পর, ২০১২ সালে মূলত তিনি বডিবিল্ডার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কেননা তার মনে হয়, শুধু ফিট বডি হওয়াই যথেষ্ট না, অন্য এক ধাপে নিয়ে যেতে হবে নিজেকে। অবশেষে কঠোর নিয়ম মেনে ৮ মাসে তিনি সিক্স প্যাক অর্জন করতে সক্ষম হন।

তিনি বলেন, মানুষ আমার এই সিদ্ধান্তকে নিয়ে অনেক হাসি-ঠাট্টা করেছে। অনেক ধরনের তিক্ত কথা থেকে শুরু করে প্রচুর নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে। তাদের মতে, আমাকে দেখতে পুরুষের মতো লাগে, নারীসূলভ নই একদমই। এমনকি আমার পোষাক নিয়েও খারাপ মন্তব্য করেছে। কিন্তু কাউকেই আমি আমার গন্তব্যপথে বাঁধা হতে দেইনি। এসব মন্তব্যকে পাত্তা দেইনি। লক্ষ্য স্থির রেখে চেষ্টা করলে সফলতা আসেই- তা আমি জানতাম। আমি সেটিই করেছি।

২০১৩ সালে হাঙ্গেরীর বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ প্রতিযোগিতায় একমাত্র নারী হিসেবে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পান তিনি। কিন্তু এবারও বাধা! সেই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হওয়ার পনেরদিন আগে এক দুর্ঘটনায় পরিবারের তিনজন সদস্য মারা যায় তার, ফলে দৃঢ় মানসিকতা অনেকটাই টলে যায়, অনেকটাই ভেঙে পড়েন তিনি। কিন্তু তার স্বামী জানতেন এই প্রতিযোগিতাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিরনের জন্য এবং স্বামীর সহযোগিতায়, ভরসায় আস্থা পেয়ে প্রতিযোগিতাটিতে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সে প্রতিযোগিতায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন তিনি এবং সবচেয়ে সুন্দর শরীরের খেতাব পান।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলেও ভারতের কোনো প্রতিযোগিতায় তিনি কখনোই অংশগ্রহণ করেন না। কারণ হিসেবে বলেন- বডিবিল্ডিংয়ে নারীদের বিকিণি পরবার প্রয়োজন হয় এবং আমি জানি বেশীরভাগ ভারতীয়রা আমার বিকিণির দিকেই তাকিয়ে থাকবে, আমি জিতলাম কি হারলাম, সেটা কোনো বিষয় না তাদের কাছে। কিন্তু অন্যান্য দেশে বডিবিল্ডিংকে খেলা হিসেবেই নেয়া হয় এবং বিকিণি তাদের কাছে শুধুই একটি পোশাক।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*