বিয়ের পরও কলেজছাত্রী প্রেমিকাকে বাধ্য করতেন শারীরিক সম্পর্কে


কলেজ পড়ুয়া মেয়ে। বয়স আঠারো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাসছে তার নগ্ন ছবি। প্রাণপ্রিয় প্রেমিক অন্য মেয়েকে বিয়ের পরও তার সঙ্গে অবাধ সম্পর্ক চাইছিল।

বাধা দিয়েছিলেন। বাধা দেয়ায় ফল হলো বিপরীত। ক্ষুব্ধ হয়ে প্রেমিক তার নগ্ন ছবি ছড়িয়ে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সিলেটে জাফলংয়ে ঘটনাটি ঘটেছে।

প্রভাবশালী চক্রের এই কর্মকাণ্ডে হতবাক কলেজছাত্রীর মা-ও। মেয়েকে রাখছেন চোখে-চোখে। ওসিসিতে চিকিৎসা শেষে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। প্রভাবশালীদের চোখ রাঙানির কারণে বাড়িঘর ছেড়ে তিনি এখন দেশান্তরী। মামলা করেও পাচ্ছেন না পুলিশের সহযোগিতা। আসামিরা প্রভাবশালী হওয়া এখন জীবন নিয়ে মা ও মেয়ে পড়েছেন শঙ্কায়। জাফলংয়ের নয়াবস্তি এলাকার বাসিন্দা ওই কলেজছাত্রী। পড়ালেখা করে পার্শ্ববর্তী জৈন্তাপুর উপজেলার একটি কলেজে। একই গ্রামে বোনের বাড়িতে বাস করে তাহের মিয়া।

তার দুলাভাই জাফলংয়ে প্রভাবশালী আলীম উদ্দিন। বালু, পাথর লুটপাটের অভিযোগের অন্ত নেই আলীম উদ্দিনের বিরুদ্ধে। তাহের মিয়ার মূল বাড়ি উপজেলার আত্তর খলমাধব টেকনাগুল গ্রামে। তার পিতার নাম ফয়জুল ইসলাম। বছরখানেক আগে ওই কলেজছাত্রীর সঙ্গে তাহের মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কলেজে যাওয়া-আসার পথে তাদের প্রায়ই দেখাসাক্ষাৎ হতো। তারা ডেটিংয়ে যেতো। গত ১৫ই নভেম্বর সিলেটের গোয়াইনঘাট থানায় তাহের মিয়া ও তার দুলাভাইয়ের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন আইনে মামলা করেছেন ওই কলেজছাত্রী। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, নয়াবস্তি গ্রামে আলীম উদ্দিনের বাড়িতে তার শ্যালক তাহের মিয়া বসবাস করতো। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ার কারণে প্রায় সময় তাহের তাদের বাড়িতে আসতো।

এক সময় তাদের দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৮ সালের ২৬শে অক্টোবর মধ্যরাতে তাহের মিয়া তার শয়নকক্ষে চুপিসারে প্রবেশ করে। এ সময় তাহের শারীরকি সম্পর্ক গড়তে চাইলে বাধা দেন কলেজছাত্রী। এক পর্যায়ে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে সে কলেজ ছাত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এজাহারে ওই কলেজছাত্রী জানান, গত ২১শে আগস্ট তাহের মিয়া তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করে। এরপর থেকে তাহেরের সঙ্গে ওই কলেজছাত্রীর মনোমানিল্য দেখা দেয়। ওই ছাত্রী তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

এদিকে- বিয়ের তিনদিনের মাথায় গত ২৫শে আগস্ট রাত ১১টার দিকে তাহের ওই কলেজছাত্রীর বাড়ি আসে। এ সময় সে পূর্বের মতো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। তার এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি ছাত্রীটি। এক পর্যায়ে তাহের হুমকি দিয়ে বলে, তার কাছে থাকা পূর্বের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেবে। এই রকম হুমকি-ধমকি দিয়ে সে ওই রাতে জোরপূর্বক ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছাত্রীকে ধর্ষণ করে। পরে ২৬শে অক্টোবরও সে একইভাবে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে ধর্ষণ করে। পরে ওই কলেজছাত্রী তার পরিবারকে বিষয়টি জানালে তারা তাহেরের দুলাভাই আলীম উদ্দিনের কাছে বিচার প্রার্থী হন।

বিষয়টি জানার পর আলীম উদ্দিন তার পরিবারকে হুমকিসহ নানা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। এবং সে-ও একইভাবে ওই কলেজছাত্রীকে কুপ্রস্তাব দেয়। এদিকে- পারিবারিক ভাবে তাহেরের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানালে এলাকায় বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। এই অবস্থায় ওই ছাত্রী ও পরিবারকে শায়েস্তা করতে একটি ভুয়া নামের আইডি খুলে ওই কলেজছাত্রীর নগ্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যে জাফলংয়ে ওই কলেজছাত্রীর ছবি ও ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় এলাকায়। এতে করে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে কলেজছাত্রী ও তার পরিবার।

বিষয়টি জানার পর ওই কলেজছাত্রীও মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে। কলেজছাত্রীর মা জানান, বিষয়টি জানার পর তার মেয়ে একাধিক বার আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। এ কারণে তিনি সব সময় মেয়েকে চোখে চোখে রাখছেন। মামলা দায়েরের পর মেয়েকে তিনি সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য নিয়ে এসেছিলেন। এরপর থেকে তিনি মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। এ কারণে এলাকার বাইরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছেন।

এদিকে মামলা দায়েরের পর গোয়াইনঘাট থানা অভিযান চালিয়ে রাতেই গ্রেপ্তার করেছে মামলার প্রধান আসামি তাহের মিয়াকে। সে বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। তবে সহযোগী আলীম উদ্দিন পলাতক রয়েছে। পলাতক আলীম উদ্দিন কলেজছাত্রীর পরিবারকে মামলা তুলে নিতে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়াইনঘাট থানার এসআই মো. আতিকুজ্জামান জুনেল জানিয়েছেন, তাহেরকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে সোপর্দ করা হয়। এরপর তার চার দিনের রিমান্ডে চাওয়া হয়েছিল। গতকাল শুনানি শেষে তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে তাকে রিমান্ডে আনা হবে বলে জানান তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া ভিডিও যাতে আর বেশি না ছড়ায় সেজন্য তিনি কাজ করেছেন। এখন আর সেই ভুয়া আইডিটি নেই। পলাতক থাকা আলীম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান।

এদিকে- ধর্ষণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছে জাফলংয়ের মানুষ। তারা ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে। ঘটনায় জড়িত তাহের ও আলীম উদ্দিনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তারা।


Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*