স্ত্রীর ‘আপত্তিকর’ ভিডিও ফেসবুকে দিলেন স্বামী


কুষ্টিয়ায় এক কলেজ ছাত্রীকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ের পর তার মাথার চুল কেটে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নগ্ন ছবি ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতারক স্বামী নাজমুল হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সোমবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে শহরের পাঁচ রাস্তার মোড় শাপলা চত্বর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ।

এর আগে, সোমবার দুপুরে ওই সংখ্যালঘু কলেজ ছাত্রী প্রতারক নাজমুল হোসেন নামের ওই স্বামীর বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া মডেল থানায় তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় একটি অভিযোগ দায়ের করে।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দিন জানান, এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। প্রতারক আসামি নাজমুলকে গ্রেফতারের কথা স্বীকার করেছেন তিনি।

ভুক্তভোগী কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের বি.বি.এ ১ম বর্ষের সোমা রাজবংশী ওরফে মোছা: আয়েশা খাতুন নামের ওই সংখ্যালঘু ছাত্রী জানান, প্রায় ৪ বছর আগে কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজে যাওয়া-আসার পথে কুষ্টিয়া পৌর এলাকার জুগিয়া হাট পাড়ার রফিকুল ইসলামের ছেলে নাজমুল হোসেন তাকে প্রায়ই উত্যক্ত করত। নাজমুল সে সময় ওই ছাত্রীর কাছে সংখ্যালঘু হিসেবে নিজের পরিচয় দেয়। এক পর্যায়ে নাজমুলের সঙ্গে ওই কলেজ ছাত্রীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

তাদের মধ্যে সম্পর্ক চলাকালীন ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর নাজমুল ওই ছাত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় এবং কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল এলাকার স্থানীয় এক কাজীর কাছে তাকে নিয়ে যায়।

এ সময় প্রতারক নাজমুল হোসেন ওই ছাত্রীকে বলেন, ‌‘আমি মুসলমান তোমাকেও মুসলমান হতে হবে’। মুসলিম পরিচয় জানার পরে ওই ছাত্রী নাজমুলকে বিয়ে করতে এবং নিজের ধর্ম পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানায়। সে সময় নাজমুল ও তার সঙ্গে থাকা অজ্ঞাত ৩-৪ জন মিলে ওই ছাত্রীকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক আগে থেকে সম্পন্ন করে রাখা দুইটি ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় এবং নোটারী পাবলিক দিয়ে মুসলমান হিসেবে হলফ নামা করে তাকে বিয়ে করে। আর বিয়ের কাবিন নামায় ওই কলেজ ছাত্রীর বাবার সঠিক নাম সুজন রাজবংশী বদলে লেখা হয় শেখ ইমতিয়াজ আলী এবং মায়ের নাম মালা রাজবংশীর পরিবর্তে লেখা হয় আফরোজা বেগম মালা।

পরবর্তীতে ওই ছাত্রী ও তার দরিদ্র পরিবার সেই বিয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং নাজমুলের সঙ্গেই সংসার করা শুরু করে। এ সময় নাজমুল শহরের ছয় রাস্তার মোড়ের পাশে এবং জেলখানা মোড়ে বাসা নিয়ে স্বামী-স্ত্রী রূপে বসবাস করতে থাকে। কিন্তু, বিয়ের এক-দেড় বছর পরে ওই ছাত্রী মেয়েটি জানতে পারে নাজমুল বিবাহিত, তার দুইটি সন্তান রয়েছে এবং সে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। এটা জানার পর এ বিষয়ে তার স্বামী নাজমুলকে জিজ্ঞেস করলে ওই ছাত্রীর উপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। নির্যাতনের অতিরিক্ত মাত্রা পৌঁছালে ওই ছাত্রী রাগ করে বাবার বাড়ি চলে আসতে বাধ্য হয়।

পরে গত ২৬ জুন নাজমুল ওই ছাত্রীর বাবার বাড়িতে এসে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাই। স্ত্রীও ক্ষমা করে দেয় এরপর মন ভালো করার নামে নাজমুল বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে মোটরসাইকেলে করে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহলবাড়ীয়া সাতবাড়ীয়া মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ওই ছাত্রীকে এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড় মারা শুরু করে। এক পর্যায়ে তার পকেটে থাকা কাইচি দিয়ে জোরপূর্বক মেয়েটির মাথার চুল কেটে দেয় প্রতারক নাজমুল। এখানেই শেষ নয়, ওই ছাত্রীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেয় সে। এ সময় মেয়েটির চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে নাজমুল পালিয়ে যায়। এই খবর শোনা মাত্র তার পরিবারের লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসে।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর থেকে নাজমুল ওই ছাত্রী এবং তার বাবা-মা সহ পরিবারের অন্যদেরকে হুমকি দেয়, এ ঘটনায় কোন প্রকার আইন-আদালতের আশ্রয় নিয়ে তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করার সময়কার শারীরিক সম্পর্কের ছবি এবং ভিডিও তার আত্মীয়-স্বজনসহ এলাকার বিভিন্ন লোকজনের কাছে এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেবে। নাজমুল আগে থেকেই ওই ছাত্রীর ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড জানার সুবাদে অ্যাকাউন্টটি নিজের আয়ত্তে নিয়ে উক্ত ফেসবুক আইডি থেকে ছাত্রীর আত্মীয়-স্বজনদের কাছে গোপনে ধারণ করা নগ্ন ছবি ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়। ফলে ওই ছাত্রী পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে চরম হেয় প্রতিপন্ন হয়।

প্রতারক নাজমুল গত ৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে দিকে ওই ছাত্রীর খালাতো ভাইয়ের ফেসবুক আইডিতে। এর পরের দিন গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে ওই ছাত্রীর জামাই বাবু দেবাশীষ বিশ্বাসের ফেসবুক আইডিতে তার বিবস্ত্র ও শারীরিক মিলনের নগ্ন ছবি পাঠায়।

এ ঘটনায় ওই ছাত্রী মানসিকভাবে চরম ভেঙে পড়ে। এখানেই শেষ নয় নাজমুল ওই ছাত্রী ও তার পরিবারকে মোবাইল ফোনে কল করে এবং ম্যাসেজ দিয়ে বিভিন্ন প্রকার হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছে বলে জানা যায়। এমন হুমকির কারণে ওই ছাত্রী ও তার পরিবার বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলেও জানা গেছে।

নাজমুলের অব্যাহত হুমকির কারণে তার পড়াশোনা এবং কলেজ যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।

জানা যায়, প্রতারণার শিকার সংখ্যালঘু সোমা রাজবংশী নামের ওই কলেজ ছাত্রী পৌর এলাকার বারখাদা উত্তর পাড়া এলাকার দিনমজুর সুজন রাজবংশী ও সোমা রাজবংশীর একমাত্র কন্যা।


Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*