কিশোরের সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্কে বাধা হওয়ায় স্বামীর প্রাণ নিল স্ত্রী


ভৈরবে রেলওয়ে কর্মচারী মাহবুবুর রহমান (৩৮) খুনের ঘটনার রহস্য উম্মোচন হয়েছে। নিহতের স্ত্রী রোকসানা আক্তার (২৮) এবং তার প্রেমিক হাসিব মিয়া (১৯) কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক শহীদুল আলম চৌধুরীর খাস কামরায় জবানবন্দিতে খুনের ঘটনার বিস্তারিত কাহিনী জানায়।

জবানবন্দিতে তারা স্বীকার করে পরকীয়ার কারণেই পরিকল্পনা করে গভীর রাতে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন অবস্থায় তাকে একাধিক ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। হত্যার পর নাটক সাজাতে প্রেমিক হাসিব তার স্ত্রীকে হালকা ছুরিকাঘাত করে আহত করে এবং স্ত্রী রোকসানা ঘটনাটি ডাকাতি বলে প্রচার করে।

প্রেমিক হাসিব নিহত মাহাবুবুরের প্রতিবেশী। তার বাবার নাম বাবুল মিয়া এবং সে উপজেলার শিমুলকান্দি কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র। এলাকাবাসীর মতে হাসিব লম্পট ছেলে। তার ইভটিজিং ও অত্যাচারে আরেক প্রতিবেশী সেলিম মিয়া নিজের মেয়ে রুমাকে নিয়ে বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছে এমন অভিযোগ প্রতিবেশীদের।

হত্যার ঘটনার একদিন পর গত শুক্রবার দুপুরে ভৈরব থানা পুলিশ তাকে তার পাসপোর্টসহ সন্দেহমূলকভাবে আটক করে। আটকের কথা প্রথমে মিডিয়াকে জানায়নি পুলিশ। এরপর গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় আটকের ঘটনা স্থানীয় সাংবাদিকদের জানায়। হত্যার কথা পুলিশের কাছে সে স্বীকার করার পর পুলিশ গতকাল রাতেই হাসিবের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তার রক্তমাখা প্যান্ট ও শার্ট তাদের বাড়ির কাছে একটি জমি থেকে উদ্ধার করে।

এদিকে বাজিতপুর জহিরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত রোকসানা আক্তারকে শনিবার দুপুরে হাসপাতাল থেকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। এরপর রাতে পুলিশ দুজনকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা অকপটে হত্যার কথা স্বীকার করে পুলিশের কাছে।

কিশোরগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক শহীদুল আলম চৌধুরীর কাছে জবানবন্দিতে হাসিব বলেন, রোকসানার সঙ্গে ছয়মাস যাবৎ আমার প্রেমের সম্পর্ক। তার সঙ্গে প্রায় সময় শারীরিক মেলামেশা হতো। তার স্বামী প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে ভৈরবের বাসায় এলে আমাদের শারীরিক মেলামেশার ডিস্টার্ব হতো। রোকসানা আমাকে খুব ভালবাসতো। এ কারণে দুজনে মিলে পরিকল্পনা করি একদিন রাতে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেব।

পরিকল্পনা অনুযায়ী বুধবার রাতে আমি বাজারের ইসা ফার্মেসি থেকে কয়েকটি ঘুমের ট্যাবলেট কিনে তার স্ত্রীকে দেয়। রাতে তার স্ত্রী ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়াইয়া তাকে অচেতন করে। গভীর রাতে খবর দিয়ে বাসার গেট ও রুমের দরজা খুলে দিলে আমি রুমে প্রবেশ করে তাকে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করি। এসময় ঘরে রাখা ছুরি রোকসানা আমার হাতে তুলে দেয়। হত্যার পর পর আমার রক্তমাখা প্যান্ট ও শার্ট জমিতে ফেলে দেই। তারপর আমি আমার ঘরে চলে আসি।

রোকসানা জবানবন্দিতে বলেন, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি হাসিবকে দিয়ে মাহাবুবুরকে হত্যার পর ডাকাতরা রুমে ঢুকে তাকে হত্যা করেছে একথা প্রচার করি। প্রথমে আমার বড় ছেলে আজিজুলকে (১০) ঘুম থেকে ডেকে তুলে ঘটনাটি জানাই। এসময় হাসিবের ঘরে খবর দিতে বলি ছেলেকে। এটা ছিল আমার মিথ্যা সাজানো ঘটনা। তারপর দু’তলায় থাকা আমার জা কান্নার আওয়াজ শুনে আমার রুমে এলে তাকে বলি রুমে ডাকাত ঢুকে তাকে হত্যা করে এবং আমাকে আহত করে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। মাহবুবুরকে রাতে কয়েকটি ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ানোর পর সে অচেতন হয়ে পড়েছিল বলে তিনি জানান। ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে হাসিব খুন করে। এভাবেই তারা দুজন আদালতে জবানবন্দি দিয়ে খুনের অপরাধের কথা স্বীকার করে।

বুধবার গভীর রাতে রেলওয়ের কর্মচারী মাহবুবুর রহমান নিজ বাসায় খুন হন। তিনি ঢাকায় কর্মরত থাকলেও প্রতি সপ্তাহে ভৈরবে নিজ বাসায় আসতেন। তার পরিবার সন্তানসহ ভৈরবের বাসায় থাকতেন। তার অনুপস্থিতিতে স্ত্রী রোকসানা আক্তার প্রতিবেশী হাসিবের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে। ঘটনার রাত সাড়ে তিনটায় তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় খুন করে। এরপর বড় ভাই সাংবাদিক এ ঘটনায় থানায় ৩/৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে বুধবার রাতেই মামলা করেন।

ভৈরব থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাহীন জানান, তার স্ত্রী রোকসানা ও প্রেমিক হাসিব হত্যার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করার পর তারা দুজন রোববার বিকেলে কিশোরগঞ্জ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যার পরিকল্পনাসহ সব ঘটনা স্বীকার করে। আদালতে খুনের অপরাধের কথা তারা স্বীকার করেছে। ক্লুবিহীন একটি হত্যা ছিল এটি। মাত্র দুদিনের মধ্যই পুলিশের প্রচেষ্টায় হত্যার অপরাধীদের গ্রেফতারসহ খুনের ঘটনাটি উম্মোচন হলো।


Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*